সোমবার, ০৪ মে ২০২৬, ১২:৪৬ অপরাহ্ন

হামে মৃত্যুঝুঁকি বাড়ছে, দেড় মাসে ২৯৪ শিশুর প্রাণহানি

নিজস্ব প্রতিবেদক, একুশের কণ্ঠ:: হাম বিশ্বের সবচেয়ে সংক্রামক ভাইরাল সংক্রমণগুলোর মধ্যে একটি। দেশে অত্যন্ত সংক্রামক ভাইরাসজনিত রোগ হামের প্রাদুর্ভাব দেখা দিয়েছে। দেশের বিভিন্ন হাসপাতালে প্রতিদিনই ভর্তি করা হচ্ছে হাম আক্রান্তদের। বিভিন্ন স্থানে হঠাৎ শিশুদের মধ্যে হামের সংক্রমণের ফলে আক্রান্ত শিশুদের অনেকে মৃত্যুবরণও করেছে। দেশে হামের প্রাদুর্ভাবে গত দেড় মাসে মোট ২৯৪ শিশুর মৃত্যু হয়েছে, যা জনস্বাস্থ্য পরিস্থিতি নিয়ে নতুন করে উদ্বেগ সৃষ্টি করেছে। সর্বশেষ ২৪ ঘণ্টায় হাম ও এর উপসর্গ নিয়ে আরও ১০ শিশুর মৃত্যুর তথ্য জানিয়েছে স্বাস্থ্য অধিদপ্তর।

স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের সর্বশেষ তথ্য অনুযায়ী, গত এক দিনে নিশ্চিত হামে একজন এবং উপসর্গ নিয়ে নয়জনের মৃত্যু হয়েছে। এ নিয়ে দেশে নিশ্চিতভাবে হামে মৃত্যুর সংখ্যা দাঁড়িয়েছে ৫০ জনে এবং উপসর্গজনিত মৃত্যু বেড়ে হয়েছে ২৪৪ জন। গত ১৫ মার্চ থেকে এ পর্যন্ত মোট মৃত্যুর সংখ্যা দাঁড়িয়েছে ২৯৪ জনে।

একই সময়ে নতুন করে আক্রান্ত হয়েছেন ১ হাজার ১৬৬ জন। এর মধ্যে নিশ্চিত রোগী ৯৫ জন। এখন পর্যন্ত মোট নিশ্চিত হামের রোগী শনাক্ত হয়েছে ৫ হাজার ৩১৩ জন এবং উপসর্গ নিয়ে হাসপাতালে ভর্তি হয়েছেন ২৭ হাজার ৮১৬ জন।

বিশেষজ্ঞরা বলছেন, আক্রান্তের সংখ্যা কমার প্রবণতা থাকলেও শিশুমৃত্যুর ধারা কিছুদিন অব্যাহত থাকতে পারে। তাদের মতে, হামে আক্রান্ত শিশুদের চিকিৎসায় আইসিইউ নির্ভরতা কমিয়ে সময়মতো অক্সিজেন সাপোর্ট ও প্রাথমিক চিকিৎসা নিশ্চিত করা গেলে অনেক মৃত্যু এড়ানো সম্ভব।

চিকিৎসকের মতে, হাম একটি অত্যন্ত ছোঁয়াচে ভাইরাসজনিত রোগ, যা আক্রান্ত ব্যক্তির হাঁচি-কাশির মাধ্যমে দ্রুত ছড়ায়। জ্বর, সর্দি, চোখ লাল হওয়া ও শরীরে লালচে ফুসকুড়ি এর প্রধান লক্ষণ। গুরুতর ক্ষেত্রে নিউমোনিয়া, ডায়রিয়া বা মস্তিষ্কে সংক্রমণ হতে পারে।

হাম রোগের ভাইরাসের নাম হলো মিজল্স ভাইরাস (Measles virus)। এটি প্যারামিক্সোভিরিডি (Paramyxoviridae) পরিবারের মর্বিলিভাইরাস (Morbillivirus) গণের অন্তর্গত একটি ভাইরাস। এই ভাইরাসটি আক্রান্ত ব্যক্তির নাক এবং গলার মিউকাস মেমব্রেনে বাস করে এবং মূলত কাশি, হাঁচি, এমনকি অন্যদের কাছাকাছি শ্বাস-প্রশ্বাসের মাধ্যমে ছড়িয়ে পড়ে।

একবার বাতাসে ছেড়ে দিলে, হামের কণাগুলো পৃষ্ঠের উপর বা বাতাসে দুই ঘণ্টা পর্যন্ত থাকতে পারে। দূষিত পৃষ্ঠ স্পর্শ করে চোখ, নাক বা মুখ ঘষলেই সংক্রমণ হতে পারে।

হাম ছড়ানোর সাধারণ উপায়:

১. সংক্রামিত ব্যক্তির সাথে সরাসরি যোগাযোগ।

২. শ্বাস-প্রশ্বাসের ফোঁটার মাধ্যমে (কাশি বা হাঁচি থেকে) বায়ুবাহিত সংক্রমণ।

৩. দরজার হাতল বা আসবাবের মতো দূষিত জিনিস স্পর্শ করা এবং তারপর আপনার মুখ স্পর্শ করা।

লক্ষণ দেখা দেয়ার আগেই, সংক্রামিত ব্যক্তি অজান্তেই ভাইরাসটি ছড়িয়ে দিতে পারে। ফুসকুড়ি দেখা দেয়ার ৪ দিন আগে থেকে ৪ দিন পরে পর্যন্ত হাম সংক্রামক।
একবার শরীরের ভেতরে প্রবেশ করলে, ভাইরাসটি দ্রুত গলা, ফুসফুস, লিম্ফ নোডের মতো অঞ্চলে বৃদ্ধি পায় এবং পরে চোখ, মূত্রনালী, রক্তনালী এমনকি মস্তিষ্কেও ছড়িয়ে পড়ে। সাধারণত সংস্পর্শে আসার ৯ থেকে ১১ দিন পরে লক্ষণগুলো দেখা দেয়।

টিকা না নেয়া প্রায় ৯০ ভাগ মানুষ যদি আক্রান্ত ব্যক্তির সাথে একই বাড়িতে বাস করেন, তাহলে তাদের হাম হয়ে যাবে।

স্বাস্থ্য ব্যবস্থাপনায় সমন্বয়ের ঘাটতির কথাও তুলে ধরেছেন বিশেষজ্ঞরা। তারা বলেন, স্থানীয় পর্যায়ের চিকিৎসক ও জেনারেল প্র্যাকটিশনারদের সম্পৃক্ত করা গেলে রোগীদের অপ্রয়োজনীয় হাসপাতালে ছুটোছুটি কমানো যেত এবং দ্রুত চিকিৎসা নিশ্চিত করা সম্ভব হতো।

এ বিষয়ে স্বাস্থ্য ও পরিবার কল্যাণমন্ত্রী সরদার মো. সাখাওয়াত হোসেন জানিয়েছেন, দেশে হামের টিকাদান কার্যক্রম জোরদার করা হয়েছে। বর্তমানে টিকা গ্রহণযোগ্য শিশুদের মধ্যে ৮১ শতাংশের বেশি ইতোমধ্যে টিকার আওতায় এসেছে। তিনি আশাবাদ ব্যক্ত করে বলেন, শিগগিরই শতভাগ শিশুকে টিকার আওতায় আনা সম্ভব হবে। একই সঙ্গে তিনি দাবি করেন, দেশে পর্যাপ্ত টিকা মজুত রয়েছে এবং সরবরাহ স্বাভাবিক আছে।

জনস্বাস্থ্যবিদ অধ্যাপক ডা. আবু জামিল ফায়সাল বলেন, কোভিড-১৯ মহামারির সময় অন্যান্য টিকাদান কর্মসূচিতে মনোযোগ কমে যাওয়ায় হামের পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণের বাইরে চলে গেছে। তিনি জোর দিয়ে বলেন, সঠিক তথ্য-উপাত্তের অভাব ও দীর্ঘদিনের পরিকল্পনার ঘাটতির কারণেই বর্তমান পরিস্থিতির সৃষ্টি হয়েছে।

বিশেষজ্ঞদের মতে, হামে আক্রান্ত হওয়ার পরপরই যথাযথ চিকিৎসা না পেলে পরবর্তীতে নিউমোনিয়া বা ডায়রিয়ার মতো জটিলতা দেখা দেয়, যা মৃত্যুঝুঁকি বাড়ায়। তাই প্রাথমিক পর্যায়ে দ্রুত চিকিৎসা নিশ্চিত করাই মৃত্যুহার কমানোর মূল চাবিকাঠি।

বর্তমান পরিস্থিতিতে জনস্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞরা টিকাদান জোরদার করা, স্থানীয় পর্যায়ে চিকিৎসা সেবা সম্প্রসারণ এবং সচেতনতা বৃদ্ধির ওপর গুরুত্বারোপ করেছেন।

চিকিৎসকের মতে, হাম একটি অত্যন্ত ছোঁয়াচে ভাইরাসজনিত রোগ, যা সাধারণত আক্রান্ত ব্যক্তির সংস্পর্শে আসার ৭ থেকে ১৪ দিন পর প্রকাশ পায়। হামের প্রধান লক্ষণ হলো তীব্র জ্বর (১০৪ ফারেনহাইট পর্যন্ত), সর্দি, কাশি, চোখ লাল হওয়া এবং এরপর সারা শরীরে লালচে ফুসকুড়ি ছড়িয়ে পড়া। সাধারণত ভাইরাস সংক্রমণের ১০-১৪ দিন পর লক্ষণগুলো দেখা দেয়। এর আগে মুখে, বিশেষ করে গালে, ছোট সাদা দাগ দেখা যেতে পারে।

হামের ভাইরাসের সংস্পর্শে আসার পরেও, কিছু প্রতিরোধমূলক ব্যবস্থা সংক্রমণের ঝুঁকি বা অসুস্থতার তীব্রতা উল্লেখযোগ্যভাবে হ্রাস করতে পারে:

পোস্ট-এক্সপোজার টিকা হাম, মাম্পস এবং রুবেলা (এমএমআর) টিকা, যদি সংস্পর্শে আসার ৭২ ঘণ্টার মধ্যে দেয়া হয়, তাহলে হাম প্রতিরোধ করতে বা এর তীব্রতা কমাতে সাহায্য করতে পারে।

এটি বিশেষ করে অ-টিকাপ্রাপ্ত ব্যক্তিদের জন্য সুপারিশ করা হয়, যার মধ্যে প্রাদুর্ভাবের সময় ছয় মাসের বেশি বয়সী শিশুরাও অন্তর্ভুক্ত।

হিউম্যান নরমাল ইমিউনোগ্লোবুলিন এইচএনআইজি হলো পূর্বে তৈরি অ্যান্টিবডির একটি ইনজেকশন যা হামের বিরুদ্ধে স্বল্পমেয়াদী, তাৎক্ষণিক সুরক্ষা প্রদান করে।

সংবাদটি শেয়ার করুন

© All rights reserved © 2024  Ekusharkantho.com
Technical Helped by Curlhost.com